ভালো শ্রোতা হওয়া যায় কীভাবে, আসলেই কি আমরা অন্যের কথা শুনি

ধরা যাক, একজন বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছেন, যিনি কথা বলতেই পছন্দ করেন। সে আকস্মিকভাবে একটি প্রশ্ন করেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে আপনার মন অন্য কোথাও চলে গেল, কিন্তু সে কী বলছিল, তাতে আপনি কোনো কিছু জানতে পারেননি। তবুও লজ্জা ঢাকতে মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করলেন, যেন সবকিছু শুনেছেন। এই দৃশ্য কি অপরিচিত? অনেকেরই এমন অভিজ্ঞতা ঘটে। আমরা আওয়াজ শুনি, কিন্তু কথার প্রকৃত অর্থ, অনুভূতি বা গভীর বার্তা বুঝতে পারি না।

জীবনযাপন ডেস্ক
আপডেট: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০: ০৫
যদি আপনি মন দিয়ে না শুনেন, তবে সম্ভবত অপরপক্ষও আপনাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না; এতে ভুল বুঝাবুঝির সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।

মার্কিন কথোপকথন বিশেষজ্ঞ ডেব্রা ফাইন (‘দ্য ফাইন আর্ট অব স্মল টক’ বইয়ের লেখক) বলেন, ‘অনেক সময় আমরা মনে করি, “এই কথাটি তো আগে শুনেছি,” এবং ঠিক তখনই মন বিভ্রান্ত হয়ে যায়। এ কারণে কথার গুরুত্বপূর্ণ সূক্ষ্ম দিকগুলো আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়।’ ফলে, ভালো শ্রোতা হওয়া শুধুমাত্র সৌজন্যের একটি দিক নয়, বরং এটি একটি সুস্থ সম্পর্ক এবং বুঝাপড়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ভালো শ্রোতা হওয়া কেন এত জরুরি
কথোপকথনের মধ্যে মন হারিয়ে ফেলা—অবশ্যই তা স্বামী-স্ত্রী, বন্ধু, সহকর্মী বা পরিবারের সদস্য সকল ক্ষেত্রে অশোভন; কিন্তু সমস্যা টিকতে সেখানেই শেষ নয়।

যদি আপনি মন দিয়ে শুনেন না, তবে প্রায় নিশ্চিত যে আরেকজনও আপনাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। এই অবস্থায় ভুল বোঝার শঙ্কা বেড়ে যায়।

২০২৪ সালে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, শ্রোতারা প্রায় ২৪ শতাংশ সময় অন্য দিকেই মনোনিবেশ করে; তবে বক্তারা মনে করেন, তাদের কথা মনযোগ দিয়ে শোনা হচ্ছে। বাস্তবে, আমরা এই শ্রবণ নিহিত করার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে দক্ষ।

২০২২ সালে আরও একটি গবেষণা নির্দেশ করছে, আপনি যখন মনোযোগ দিয়ে কাউকে শোনেন, তখন তার সঙ্গে মতবিরোধ থাকলেও তিনি আপনার বক্তব্য গ্রহণে বেশি আগ্রহী হন।

সবচেয়ে কাছের বন্ধুকে যে ৭টি প্রশ্ন অবশ্যই করবেন
শোনা কি এক রকমের হয়?
সব ধরনের শ্রবণ এক রকম নয়।

প্যাসিভ লিসনিং (নিষ্ক্রিয় শোনা)
সাধারণ আলাপচারিতার মতো—শব্দ কানে প্রবাহিত হয়; কিন্তু মন সম্পূর্ণভাবে দৃঢ় থাকে না।

অ্যাকটিভ লিসনিং (সক্রিয় শোনা)
গুরুত্বপূর্ণ কথোপকথন সময়ে আমরা যা করি—মনের, চোখের, শরীরের, অনুভূতির—অংশগ্রহণ করে শুনতে হয়।

অ্যাকটিভ লিসনিংয়ের তিনটি দিক রয়েছে—

বুদ্ধিবৃত্তিক শোনা: কথার অর্থ উপলব্ধি করা।

আচরণগত শোনা: চোখের দৃষ্টি ও ভঙ্গি দিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করা।

আবেগগত শোনা: কথার অন্তর্নিহিত অনুভূতি বোঝা।

ভালো শ্রোতা হতে চাইলে যেসব চর্চা করা জরুরি
১. মনোযোগ প্রভাবিত করে এমন সবকিছু সরিয়ে ফেলুন
মোবাইলকে সাইলেন্ট করে উল্টো করে রাখুন। টিভি বন্ধ করে দিন। চেষ্টা করুন শান্ত পরিবেশে কথা বলতে।
মন সংগ্রহে সমস্যা হলে ডেব্রা ফাইনের পরামর্শ—
কথাগুলো মনে মনে পুনরাবৃত্তি করুন, অথবা অন্য ভাষায় অনুবাদ করার চেষ্টা করুন।

২. অস্থির নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণে রাখুন
কিছু মানুষের জন্য নড়াচড়া মনোযোগ রাখার সহায়ক হতে পারে; তবে পা দোলানো বা কলম ঠোকা দেখলে মনে হতে পারে, আপনি মনোযোগ দিচ্ছেন না।
নড়াচড়ার প্রয়োজন হলে আংটি, ব্রেসলেট বা নিঃশব্দ ফিজেট ব্যবহার করুন।

৩. চোখে চোখ রাখুন
চারদিকে তাকালে বক্তার মনে হবে, আপনি বিরক্ত হচ্ছেন।
শ্রেষ্ঠ হলো, কথোপকথনের সময় ৬০-৭০ শতাংশ সময় চোখের সংযোগ স্থাপন করা।
যাদের জন্য চোখে চোখ রাখাটা কঠিন, তারা মুখের অন্য অংশে, যেমন নাকের দিকে তাকাতে পারেন।

৪. মাথার ভেতরে উত্তর তৈরি করা বন্ধ করুন
অনেক সময় আমরা অন্যের কথা শুনতে শুনতে চিন্তা করতে থাকি, পরবর্তী কি বলব। এতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা অগ্রাহ্য হয়। অন্য ব্যক্তি শেষ না করা পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত। প্রয়োজন হলে কিছুক্ষণ থামুন, তারপর সাড়া দিন।

অনেক সময় আমরা অন্যের কথা শুনতে শুনতে চিন্তা করতে থাকি, পরবর্তী কি বলবছবি: প্রথম আলো
৫. কথোপকথনের সময়ে সচেতন হন
খুব তাড়াতাড়ি কথা বলা বা অসাড় নীরবতায় কথা বলা, উভয়ই সমস্যা।
একটি কার্যকর কৌশল হতে পারে—
‘আপনার কি আর কিছু বলার আছে?’—এই প্রশ্নটি করা।

৬. ছোট শব্দের মাধ্যমে জানান, আপনি শুনছেন
‘হ্যাঁ’, ‘ঠিক আছে’, ‘কী বলেন’—এই সামান্য শব্দগুলো বক্তাকে নিশ্চিন্ত করে।
সহানুভূতির ভাষা ব্যবহার করুন—
‘এটা শুনে খারাপ লাগছে’, ‘নিশ্চয়ই এটি কঠিন ছিল’—এতে বক্তা জানতে পারে যে আপনি সত্যিই সহানুভূতি সহকারে শুনছেন।

৭. কথার সারাংশ আপনার ভাষায় প্রকাশ করুন
‘আপনি বলতে চাচ্ছেন, আসলে…’—এভাবে বললে বক্তা অনুভব করবেন যে আপনি তাঁর বক্তব্যটি বোধ করতে পেরেছেন। এতে বক্তার কথাগুলো আপনার মনে রাখতে সাহায্য করবে।

শুরুতে সহজ বাক্যে আপনার আলোচনা শুরু করুন
৮. প্রশ্ন করুন
নিজের অভিজ্ঞতা না টেনে এনে প্রশ্ন করুন—
‘তুমি তখন কেমন অনুভব করেছিলে?’
‘এই কথার মানে কী ছিল?’
‘এরপর কী ঘটবে বলে মনে কর?’

৯. শরীরী ভাষার প্রতি নজর দিন
সামনে হালকা ঝুঁকে বসা আগ্রহ প্রকাশ করে। হাত-পা জড়ো করে রাখা দূরত্ব সৃষ্টি করে।
মনে রাখবেন, শরীরের ভাষা মাঝে মাঝে ভুল তথ্যও দিতে পারে।

চোখে চোখ না রাখা মানেই আগ্রহের অভাব, এমনটি নয়। যিনি শুনছেন বা বলছেন, তিনি হয়তো সবসময় চোখে চোখ রাখতে সক্ষম নন। তাই প্রতিটি বিষয়কে একইভাবে বিচার করবেন না।

মন দিয়ে শোনা মানে কেবল শব্দ শোনা নয়, মানুষকে গুরুত্ব দেওয়া।
মন দিয়ে শোনা মানে কেবল শব্দ শোনা নয়, মানুষকে গুরুত্ব দেওয়া।ছবি: প্রথম আলো
১০. যদি না শোনেন বা সময় না থাকে, তাহলে সৎ থাকুন
শুনছেন এমন ভান তৈরি করার চেয়ে ভালো হল—
‘দুঃখিত, আপনি কি একটু জোরে বলতে পারেন?’
অথবা
‘এখন আমার ভালোভাবে মন দেওয়াটা সম্ভব নয়, পরে কথা বলবো?’
এবং হ্যাঁ, সব আলাপে আপনাকে মনোযোগী থাকতে হবে, এমন নিয়ম নেই। প্রয়োজন হলে বিনয়ের সঙ্গে সরে যাওয়া ঠিক।

শেষ কথা
ভালো শ্রোতা হওয়া কোনো ইনগ্রামী বৈশিষ্ট্য নয়, এটি অভ্যাসের বিষয়। মন দিয়ে শোনা মানে শব্দ শোনা নয়, মানুষকে গুরুত্ব দেওয়া। এবং এই ছোট্ট অভ্যাসগুলো সম্পর্ককে বহু শক্তিশালী করে।

----Share This Posts----
Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
----Related Post-----
Recent Posts​
ytt
স্ট্রবেরি খেলে কি ওজন কমে
srdeg
প্রক্রিয়ায় এত গলদ, চিন্তাও করতে পারবেন না: সংস্কার না হওয়া প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা
fgewrt
মহাকাশ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংযোগ ইলন মাস্কের স্পেসএক্সে যুক্ত হলো এক্সএআই
fyjuh
আইসিসি থেকে সুখবর পেল বাংলাদেশ
edf
এ বছর ৬,৩০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে স্বর্ণের দাম!
Popular Posts
ওয়েবসাইটের ডাটাবেজ বলতে
ডাটাবেজ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম মূলত কি
ওয়েবসাইটের ডাটাবেজ বলতে কি বুঝায়
ওয়েবসাইটের ডাটাবেজ বলতে কি বুঝায়
আপনি সাইবার সিকিউরিটি শিখে কি কাজ পাবেন
সাইবার সিকিউরিটি বলতে কী কী বোঝায়
ওয়েবসাইট ফাইরাল করার উদাহরণ
ওয়েবসাইট ফাইরাল বলতে কি কি বুঝায়
কম্পিউটারকে সচল রাখে
কম্পিউটারকে সচল রাখে রেজিস্ট্রি ক্লিন আপ